Sunday, July 12, 2026

শতবর্ষে অ্যালেন গিন্সবার্গ : ‘আমেরিকা কেন তোমার গ্রন্থাগারগুলি কান্নায় ঠাসা?’ / রাজীব সিংহ

 


আরউইন অ্যালেন গিন্সবার্গ (জুন ৩, ১৯২৬ – এপ্রিল ৫, ১৯৯৭) 


শতবর্ষে অ্যালেন গিন্সবার্গ :‘আমেরিকা কেন তোমার গ্রন্থাগারগুলি কান্নায় ঠাসা?’

রাজীব সিংহ

 

আমেরিকা যা ছিল সব দিয়েছি তোমার আর আমার কিছু নেই৷

আমেরিকা দুটাকা সাতাশ পয়সা জানুয়ারি ১৭১৯৫৬৷

নিজেদের মেজাজ আমি সহ্য করতে পারি না৷

আমেরিকা কবে আমরা মানুষের হানাহানি বন্ধ করব?

যাও নিজেদের আণবিক অস্ত্র দিয়ে ধবংস কর৷

আমার ভাল্লাগছে না আমাকে বিরক্ত করবেন না৷

আমার মন ভালো নেই কবিতা লিখবো না৷

আমেরিকা কবে তুমি দেবদূত হয়ে উঠবে?

কবে তুমি ল্যাংটো হবে?

কবে তুমি কবরে শুয়ে চিনবে নিজেকে?

কবে তুমি তোমার লক্ষাধিক ট্রটস্কিপন্থীর সমান পর্যায়ে উঠবে?

আমেরিকা কেন তোমার গ্রন্থাগারগুলি কান্নায় ঠাসা?

আমেরিকা তোমার ডিমগুলো কবে ভারতবর্ষে পাঠাবে?

তোমাকে পাবার পাগলামোয় আমি নাজেহাল৷

বলো কবে বাজারে গিয়ে যা চাই তা চাউনি দিয়ে কিনে নেব?’

                                                                                                  (আমেরিকা)

ভারতবর্ষের সঙ্গে অ্যালেন গিন্সবার্গের যোগাযোগের শুরু ১৯৬২যখন তিনি পিটার অরলোভস্কির সঙ্গে এক বছরেরও বেশি সময়এখানে কাটিয়ে গেছেন৷ প্রাচ্যের দর্শনের সন্ধানেএকজন আধ্যাত্মিক প্রভুর খোঁজে ঘুরে বেড়িয়েছেন  প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে৷ গ্যারি স্নাইডার  জোয়ান কাইজারের সঙ্গে ঘুরেছেন হিমালয়ের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে৷ তাঁর ভারতে কাটানো সময়ের মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য অজন্তা-ইলোরা গুহাসাঁচি  সারনাথের স্তূপ  বৌদ্ধ মনাস্ট্রি এবং বিলম্বিত সময়ের কলকাতা  বেনারসবাস৷ প্রথম বারের এই ভারত-ভ্রমণের আগেই অ্যালেনের দু-দুটি উল্লেখযোগ্য কবিতার বই প্রকাশিত--- ‘হাউল’ এবং ‘ক্যাডিশ

প্রকাশমাত্রই ‘হাউল’ মারাত্মক রকমের জনপ্রিয়তা পেয়েছিল৷ ব্রুকলিনের গির্জাতে থাকা শীতকালীন সন্ধ্যায় থিরথিরিয়ে ওঠা গাছপালাসূর্যচাঁদ-, ফুগাৎসির নির্জন দোকানে গড়িয়ে যাওয়া বিস্বাদ বিয়রের দুপুরফুটপাতে ছুঁড়ে ফেলা ইহুদি উপাসনা মন্দিরের মাংসনিউইয়র্কের অন্ধকার-আচ্ছন্ন চূড়ান্ত নাগরিক ঘরের ভেতরে নেশা ভেঙে (ফেটেযাবার পর পুবদেশের ঘাম---, আফ্রিকার হাড়-ব্যথা---, চিনের মস্তিষ্ক-প্রদাহ বরদাস্ত করে চলাগানবাজনা অথবা সঙ্গম অথবা মাংসের ঝোল-তরকারির ধান্দায় হাউসটন শহরে ক্ষুধার্ত  আক্ষরিক অর্থে একা একা ঘুরে মরাজার্মান সঙ্গীতের গ্রামোফোন রেকর্ড ভেঙে চুরমারআকণ্ঠ হুইস্কির পর রক্তাক্ত পায়খানায় কাতর আর্তিব্যর্থ গির্জাঘরে হাঁটু পেতে পরস্পরের মুক্তি--- আলো আর হৃদয়ের জন্য প্রার্থনাপঁচিশ হাজার উন্মাদ কমরেডের একসঙ্গে ইনটারন্যাশনালের শেষ স্তবক গেয়ে ওঠা,

যেখানে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চাদরের তলায়

                                                                                জড়িয়ে ধরে চুমু খাই---

যে যুক্তরাষ্ট্র সারারাত কাশে আর ঘুমুতে দেয় না’---

---স্বপ্ণের ভেতর দিয়ে ঘুমের গভীর দিয়ে হেঁটে যাও তুমিতোমার শরীর দিয়ে সমুদ্রযাত্রার জল ঝরে পড়ে--- কার্ল সলোমনতোমার সঙ্গে রকল্যান্ডে আছেন ‘হাউল’-এর সেই কবি৷ অ্যালেন৷ যেখানে একই ভয়াবহ টাইপ রাইটারে তোমরা দু-জনেই মহান লেখক৷ সময়ের অতিজান্তব ঝোল-ঝালের সামগ্রিকতায় প্রকট  ভয়ঙ্কর রকমের দৃশ্যমান৷ আবার কখনো বিশাল নোংরা সিনেমায় অদৃশ্য হয়ে যাওয়া স্বপ্ণের মতো ধীরে ধীরে জেগে ওঠা অতৃপ্ত রোমান্সঅবদমন৷ যাবতীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণা৷  বোতল বিয়র  জন প্রেমিকা  প্যাকেট সিগারেট এবং  টা আস্ত মোমবাতি সুদ্দু আবিষ্ট সঙ্গমে খাট থেকে মেঝে--- মেঝেতে গড়াতে গড়াতে হলঘর--- দেয়াল ছঁুয়ে মূর্চ্ছা...

চরমতম থেকে স্তরে স্তরে চেতনার শেষতম বিন্দুতে ফিরে যাওয়া৷ নিংড়ে নিংড়ে নেওয়া৷ এই শিশ্ণশোষক ছিন্নমস্তার কাছে কবি নিজে শরীর-বর্জিত এক চেতনামাত্র৷ আর এই ছিন্নমস্তা কবির কাছেঅ্যালেনের উপলব্ধিতে---

চিন্তা-চেতনাদারিদ্র্যপ্রতিভার অপচ্ছায়া৷

অদৃষ্টঅযৌন হাইড্রোজেনের মেঘ৷

 

.

 


বেনারসে অ্যালেন গিন্সবার্গ, ১৯৬৩


হিপিদের পূর্ববর্তীরা ছিলেন বিটনিক বা বিট জেনারেশন৷ ভিয়েতনামের উপর আমেরিকার আক্রমণের  বিরুদ্ধেই সংগঠিত হয়েছিল হিপি আন্দোলন৷ পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে প্রাচ্যের দেশগুলিতেও এই হিপি মুভমেণ্ট একটি সাব-কালচারে পরিণতি পায়৷ বিটনিক বা বিট জেনারেশনের কবিদের অন্যতম ছিলেন জ্যাক কেরুয়াক৷ ভণ্ড মূল্যবোধসংস্কার-আচ্ছন্ন সামন্ততান্ত্রিকতানকল  বানানো মিথ্যে জীবনদর্শন--- ইত্যাদিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণই ছিল বিটদের প্রধান উদ্দেশ্য৷ এই বিটনিকদের বেশির ভাগই ছিলেন কবিশিল্পীগায়ক৷ সমস্ত ধরনের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাই ছিল বিট জেনারেশনের একমাত্র লক্ষ্য৷ অনেক সময়ই এদের রচনাশিল্পের প্রকাশভঙ্গীএমনকী জীবনযাপন আমাদের প্রথাগত তথাকথিত ‘মার্জিত’ রুচিবোধকে আঘাত করেছে৷ আর প্রতিবাদস্বরূপ এই আঘাতটুকুই ছিল বিটনিকদের একান্ত কাঙ্ক্ষিত৷ এখানে প্রসঙ্গক্রমে গিন্সবার্গের কতিপয় পংক্তি উদ্ধৃত করা যেতে পারে৷

আমি আছি তোমার সঙ্গে রকল্যান্ডে

যেখানে মাথার খুলির কর্মদক্ষতা এখন আর

                                চেতনার পোকাদের ঢুকতে দেয় না

আমি আছি তোমার সঙ্গে রকল্যান্ডে

যেখানে তুমি উটিকা শহরের চিরকুমারীদের স্তন থেকে চা পান কর

আমি আছি তোমার সঙ্গে রকল্যান্ডে

যেখানে তুমি জাহাজঘাটায় অর্ধনারীদের

                                তোমার সেবিকাদের দেহে ঢুকিয়ে দাও...

আমি আছি তোমার সঙ্গে রকল্যান্ডে

যেখানে তুমি ক্যাটাটোনিক পিয়ানোয় গেয়ে ওঠ

                                আত্মা নিষ্পাপ  অমর একে সশস্ত্র পাগলাখানায়

                                অনীশ্বর মরতে দেয়া ঠিক নয়৷

                                                                                                                (হাউল)

 

.

পাঁচের দশকের শেষে  ছয়ের দশকের আমেরিকায় প্রতিষ্ঠানবিরোধী বিকল্প সংসৃকতির দাবিতে যে বিট  হিপি আন্দোলন দানা বেঁধেছিলসেই আন্দোলনের অন্যতম কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ পোস্টমডার্ন সাহিত্য গোষ্ঠী ‘পলিটিক্সপোয়েট্রি অ্যাণ্ড ইন্সপিরেশন’-এর সদস্যদের কাছে ২৩.০৪.১৯৯২- দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেদের শিল্পভাবনা  আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করছেন এইভাবে---

কেন্দ্রীয় থিম ছিল চেতনার রূপান্তরণ৷ আর যেমন সময় এগোলোকেরুয়াকবারোজ আর আমার যে অভিজ্ঞতা জমা হলএই প্রসঙ্গটিরই তো সম্পর্কায়ন---অন্তত ‘চেতনার ক্ষেত্র বিস্তার যেমন ধরএই জাতিটিই চরম বাস্তব এবং শেষ এবং চূড়ান্তআবার একই সঙ্গে চরম অবাস্তব এবং সাময়িক এবং স্বপ্ণের মালমশলায় গড়ানির্বিরোধভাবে৷ আমার মনে হয় ১৯৫৮ নাগাদই কেরুয়াক-এর  ব্যাপারে অন্তর্দৃষ্টিনির্ভর দখল এসে গিয়েছিল৷ সুতরাং একটি আত্মিক অন্তর্দৃষ্টি--- যা শাশ্বত ভাবে সর্বজনীন--- কোনও আদল বা আদরায় মনন অথবা চেতনার অনুসন্ধানের পথ দেখাল৷ তা বারোজ কর্তৃক অপরাধ জগতের অনুসন্ধান হোককেরুয়াক কর্তৃক বৌদ্ধধর্মের অনুসন্ধান হোকগ্যারি স্নাইডারের জেন সাধনা হোককিংবা তিববতী বৌদ্ধধর্মের তদারকিতে নাবোপা ইন্সটিটিউটে আমার কাজ হোক৷ আত্মিক মুক্তিই হল মূল এবং আত্মিক মুক্তি থেকেই আসে সরলতা বা অবারিত হৃদয়৷ ম্যাকক্লুরের প্রধান থিম হল জীববিজ্ঞান৷ এবং চেতনার পুনর্দখল বিষয়ে ওর অন্তর্দৃষ্টি ছিল৷ পরিবেশ-নিসর্গের থিম৷ এটা তোমাদের সনাতন কবিতার ব্যাপার নয়৷ এটা আধুনিক আমেরিকান লোকগীতি৷ এবং তা প্রভাবিত করেছিল সবাইকে৷

 

১৯৬২-৬৩ নাগাদ এক বছরেরও বেশি সময় ভারতবর্ষে কাটানোর সময় গিন্সবার্গ ভারতের সন্ত-সন্ন্যাসীযোগীকবিলেখকভাবুকমিউজিশিয়ান এবং দলাইলামার মতো জগদ্বিখ্যাত জাতির পিতাদের মতো নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশেছিলেন গভীরভাবে৷  ছিল তাঁর আত্মানুসন্ধান প্রক্রিয়ারই এক বিস্তৃত অধ্যায়৷ কাশীর মণিকর্নিকা ঘাটের শ্মশান থেকে কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউস পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল সেই আশ্চর্য ধূসর যাত্রাপথ৷ বাংলাদেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে৷ সত্তর দশক৷ এপার পশ্চিমবাংলায় তখন বিপ্লব-বিক্ষুব্ধ৷ নকশালবাড়ির আগুনের ঢেউ গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে৷ সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে শরনার্থীশিবির৷ এক অদ্ভূত সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশের কলকাতায় অ্যালেন দ্বিতীয়বার আসেন৷ এই ছিল তাঁর দ্বিতীয় বারের ভারত-ভ্রমণ৷ মানুষের দুর্দশাহতাশানিপীড়নদারিদ্র্যঅসহায়তা--- শরনার্থীদের শিবিরগুলো বনগাঁ সীমান্তে যেতে যেতে চাক্ষুষ করেন অ্যালেন৷ এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাই অনুভূতি হয়ে ওই সময়ে লেখা অ্যালেনের বিখ্যাত কবিতা ‘সেপ্ঢেম্বর অন যশোর রোড’- হয়ে উঠেছে মন্ত্রের মতোন৷


 


বিখ্যাত কবিতাসেপ্ঢেম্বর অন যশোর রোডলেখার সময়ে

বনগাঁ সীমান্তে শরণার্থী শিবিরে অ্যালেন গিন্সবার্গ


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন,‘অ্যালেনের নিজস্ব সুরেনিজের গলায় গাওয়া এই কবিতাটির ক্যাসেট এবং সি.ডিপাওয়া যায়’ (দেশ২৫..৯৭)

এখন ইউটিউব সার্চ করলে সহজেই শোনা যায় অ্যালেনের আশ্চর্য কবিতাগান৷ ১৯৭০- গিন্সবার্গ প্রকাশ করেন ‘ইন্ডিয়ান জার্নালস গদ্যের বই৷ মুক্তিযুদ্ধের আগের  পরের ভারতবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে৷

তৃতীয়বার ভারত সফরে আসবার ইচ্ছে প্রকাশ করে ১৯৯৪- সুরঞ্জন গাঙ্গুলিকে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের একটি জায়গায় গিন্সবার্গ ভারতীয় দর্শন  সংসৃকতির প্রতি তাঁর অন্তরের টান বোঝাতে গিয়েভারতীয় সংসৃকতি থেকে তাঁর প্রাপ্তি  ব্যক্তিগত জীবনে তার প্রায়োগিক উপযোগিতার উল্লেখ করছেন এইভাবে,

কবিতাপাঠের আসরগুলিতে বৌদ্ধ  হিন্দু মন্ত্রগুলি আমি গাইতাম, ‘শ্রীরাম জয় রাম জয় জয় রাম’, ‘হরে কৃষ’ বা ‘ওম্ শ্রীমৈত্রেয়’  ‘ওম্ মণিপদ্মে হুম্’ বা ‘ওম্’ বা ‘গতে গতে পরাগতে’--- ছোট্ট তাল ঠুকে গাইতাম ‘প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র এরপর গান গাওয়ার সূত্র ধরেই মন্ত্রের প্রতি আমার যে গভীর অনুরাগ ছিলতা ক্রমে পবিত্র সঙ্গীত  উইলিয়াম ব্লেকের কবিতার দিকে ধাবিত হলো৷ ১৯৬৮ সালে আমি ব্লেকের ‘সংস অফ ইনোসেন্স অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স’ Songs of Innocence and Experience)-এর কবিতাগুলোতে সুর দিতে শুরু করলাম৷ আর ১৯৬৯ সালের মধ্যেই আমি নিজের লেখা লোকগান তৈরির পাশাপাশি ব্লেকের সেই সুর করা গানগুলো রেকর্ড করতে শুরু করলাম৷ এভাবেই গানের জগতে জড়িয়ে গেলাম৷ ১৯৬৩-তে বব ডিলান-এর সঙ্গে আলাপের পরই গানের আঙ্গিকে থাকা নতুন ধারার কবিতার প্রতি আমি আগ্রহী হয়ে উঠি যে ধারার ওপর ‘আর্লিয়ার বিট জেনারেশন’ এবং কেরুয়াক  আমার নিজের কাজের প্রভাব ছিল৷ ১৯৭০- তাঁর (বব ডিলানসাথে রেকর্ড করলাম গান৷ অতএব ওই যে একটা বীজ পোঁতা হয়েছিলযার নাম ‘মন্ত্র’, তার থেকেই এতোকিছু হয়ে গেল৷ সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা হয়ে উঠল৷ কবিতা  গানের মধ্যেকার সেই গভীর সংযোগ উদ্ধার করতে আমাকে সাহায্য করেছিল ভারত৷ দেশটি আমাকে যেমন একটি আদর্শ বা মডেল উপহার দিয়েছিলতেমনি গানের মাধ্যমে সাধু-সন্তদের রচিত কবিতার সাথেও পরিচিত করিয়েছিল৷’ (দ্য টেলিগ্রাফ১৬..৯৪.,কলকাতা)

 

বব ডিলান অ্যালেন গিন্সবার্গ

জ্যাক কেরুয়াকের মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণায় কিউবিক সিটি ফেস্টিভ্যালে যে কথাগুলি লেখা হয়েছিল তা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় ঝাঁ-চকচকে মেট্রোপলিসের জীবনযাপনের বিপ্রতীপে কতোটা মাটির কাছাকাছি ছিল এই কবিশিল্পীরা৷ ‘সমাজের মূল স্রোতে একটা ছোটো বাঁকা রাস্তার মতো ছিল বিটদের অবস্থান৷ চলে গেলেন বিটদের রাজা৷ বর্মহীননগ্ণ৷’ এই কথাএই নিস্তরঙ্গ মৃত্যুবরণ বিটপ্রজন্মের অন্যান্য কবিশিল্পীদের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য৷

বিট প্রজন্মের শুরুর দিনগুলির কথা জানা যায় কেরুয়াকের সঙ্গে একটা সম্পূর্ণ অ্যাপার্টমেণ্ট শেয়ার করে দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা এডিথ পার্কারের ভাষ্য থেকে--- ‘সবচেয়ে বড়ো কথা,118 th Street-  আমাদের অ্যাপার্টমেণ্টের সেই অলীক দিনগুলিভবিষ্যত-বিখ্যাতরা যেখানে আছেন দরজার ওপারে৷ উদাহরণ১৭ বছরের অ্যালেন গিন্সবার্গ আর উইলিয়ম বারোজ’ (দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল১৯৮৯টরণ্টো)

এক কথায় এটুকু বুঝে নিতে কোনও দ্বিধা নেই যে বিটনিকদের জনক জ্যাক কেরুয়াকের সঙ্গে অ্যালেনের কতো অল্প বয়স থেকে যোগাযোগ  ঘনিষ্ঠতা৷ পরবর্তীতে বব ডিলানজেরি গার্সিয়ার সঙ্গে অ্যালেনের বন্ধুত্ব হয়৷ ডিলানের যাবতীয় নতুন ধরনের লিরিককবিতা বা গানগুলি গিন্সবার্গ  মাইকেল ম্যাকক্লুর সমর্থন করেছিলেন নির্দ্বিধায়৷ সমালোচকের দল যাকে ইক্সেন্ট্রিক বা উদ্ভট লিরিককখনও তীক্ষ্ন চিত্রকল্পের কবিতা আবার কখনও নমনীয় ছন্দের সেরা আমেরিকান কবিতা বলে অভিহিত করেছে৷

 

.

অ্যালেনের জন্ম ১৯২৬নিউ জার্সিতে৷ জন্মসূত্রে ইহুদি৷ বাবা লুইস গিন্সবার্গমা নায়োমি৷ মাকে নিয়েই লেখা তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কবিতা ‘ক্যাডিশ’ কবিতার দুনিয়ার মানচিত্রে একটি অন্যতম নতুন মাইলস্টোন হিসেবে চিহ্ণিত৷ কবিতা লেখার আঙ্গিক  কবিতাপাঠের ধরন আমূল পালটে দিয়েছিলেন এই বিট কবি৷ গদ্যেকথা বলার ভঙ্গিতে তাঁর বেশির ভাগ কবিতা লেখা৷ আমেরিকান কবিতায় গিন্সবার্গ এক নতুন ভাষারীতির প্রবর্তন করেছিলেন সহযোগী সতীর্থ বারোজকেরুয়াকলরেন্স ফেরলিংঘেট্টিপিটার অরলোভস্কিগ্যারি স্নাইডারহার্বার্ট হাংকেকার্ল সলোমনমাইকেল ম্যাকক্লুরগ্রেগরি কোরসে প্রমুখের যৌথ প্রচেষ্টায়৷ গত শতাব্দীর সাতের দশক থেকে কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানে   রেকর্ডিংয়ে যন্ত্রানুষঙ্গের প্রয়োগ হয়ে ওঠে অনিবার্য৷ জানা যায়বেনারসে থাকাকালীন গিন্সবার্গ জনৈক ভজন গায়কের কাছে হারমোনিয়ম বাজাতে শিখেছিলেন৷ ফলস্বরূপ তাঁর রেকর্ড করা বহু কবিতায় ভজনের সুর শোনা যায়৷ কলকাতায় ‘আমজাদিয়া হোটেলে’ কাটানো তাঁর সেই  অলৌকিক সাতমাসবাংলা কবিতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়৷ সে সময় বাউল অশোক ফকির ছিলেন তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী৷ এছাড়াও সঙ্গী ছিলেন কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠী  হাংরি কবিকুলও৷ তাঁরাই কলকাতা শহরের সঙ্গে গিন্সবার্গের পরিচয় করান৷

রাশিয়া তোমার চোখদুটোর সাথে কপর্দকশূণ্যতা

তোমার চোখগুলোর সঙ্গে মিথ্যে চিন তোমার দুচোখ দিয়ে

ক্ষুৎপীড়িত ভারত তোমার দুচোখে

আরেকটা ভুল করে ফেলা আমেরিকা তোমার চোখগুলির সাথে...’

গিন্সবার্গ যে সংযোগ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তা তাঁর ‘ক্যাডিশ’ নামক দীর্ঘ কবিতায় প্রকাশিত৷ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন এই কবিতাটি অ্যালেন বিশেষ একটা মানসিক দশায় সম্পূর্ণ নেশাক্রান্ত অবস্থায় এক সিটিংয়ে বসে লিখেছিলেন৷  সত্যি একজন অতিবিরল মানুষ৷ কবিতার পৃথিবীতে  এই জাতীয় কোনও ঘটনার আদৌ কোনও উদাহরণ আছে কি?

 

.

হাউল অ্যান্ড আদার পোয়েমস্’-এর স্রষ্টা অ্যালেন গিন্সবার্গের প্রভাবে  বিট জেনারেশনের সূত্র ধরে নতুন ধারার বাংলা কাব্য আন্দোলন শুরু হয় সমীর  মলয় রায়চৌধুরীসন্দীপন চট্টোপাধ্যায়শক্তি চট্টোপাধ্যায়ৎপলকুমার বসু প্রমুখের যৌথ উদ্দীপনায়৷  প্রসঙ্গে কবি অরুণ মিত্রের একটি মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যায় যেবাংলা কবিতায় এই বিট প্রভাবিত ‘হাংরি’ প্রজন্মের আবির্ভাব কতোটা প্রভাব ফেলেছিল!

নতুন যুগের কবিতার পক্ষ নিয়ে কোলাহল করলেই তা কাব্য-আন্দোলন হয় নানানা কবি নতুন নতুন পথে পা বাড়ালেও হয় না৷ আন্দোলনে অপরিহার্যভাবে থাকে ঘোষিত অভিমতসম্মিলিত প্রয়াস এবং সচেতন পদক্ষেপ৷ আধুনিককালে প্রথমে ‘কল্লোল’ এবং অনেক পরে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার উল্লেখ করে অনেক সময় নব কাব্য প্রবর্তনার কথা বলা হয়৷ কিন্তু  প্রবর্তনাকে আন্দোলন বলা যায় না৷ আমার ধারণা শব্দটার প্রয়োগ দাবি করতে পারে শুধু ‘হাংরি’ এবং ‘শ্রুতি’ গোষ্ঠীতাদের ৎপরতার পরিধি  শক্তি যাই হোক’(কবির কথাকবিদের কথাঅরুণ মিত্র)

যদিও পরবর্তীতে সংঘবদ্ধ এই কবি-লেখকদের অনেকেই পুলিশি হামলার কারণে সরে আসেন এই আন্দোলন থেকে৷ 

৭১ বছর বয়সে নিউইয়র্কে ..১৯৯৭- অ্যালেনের মৃত্যুর পর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ‘আমাদের বন্ধু অ্যালেন’ গদ্যে লিখছেন,‘অ্যালেনের সাথে আমাদের বন্ধুত্বের (লেট-ফিফটিজএকটাই ফল হল--- গদ্য কৃত্তিবাস (যার একটি সংখ্যাই প্রকাশিত হয়েছিল---প্রচ্ছদে ব্যবহৃত হয়েছিল অ্যালেনের শাটারে তোলা স্ন্যাপএবং নতুন ধারার কাব্য আন্দোলন--- হাংরি জেনারেশন’ (আজকাল১৩..১৯৯৭কলকাতা)

এই অ্যালেনই ২৮..১৯৬৪ তারিখে অশ্লীলতার আসামী, ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীকে চিঠিতে লিখেছেন,‘গদ্য  রাজনীতি বিষয়ে ম্যানিফেস্টোগুলো চমৎকার  মজাদার৷ আমার মনে হয় সাহিত্যপুষ্ট তাদের শিরোনাম৷ কিন্তু মস্তিষ্কে কিছু খোঁচা তারা মারবেই৷ গুড লাক’ (হাংরি শ্রুতি  শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনউত্তম দাশ১৯৮৬) একজন আমেরিকান কবি ভরসা যোগাচ্ছেন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানো তরুণ বাঙালি কবিকে৷ এমনকি তাঁর ভাই র্যালফ গিন্সবার্গ সম্পাদিত ‘আঁভাগার্দ’ পত্রিকায় মলয় রায়চৌধুরীর একটি সচিত্র বিবৃতি প্রকাশ করেন যা সাহিত্যজগতে হৈচৈ ফেলে দেয়৷ কবিতা কেমন হবেপ্রতিদিনের উচ্চারিত হাঁচি-কাশি-সংলাপের-খিস্তির নাকি ছন্দোময় ব্যঞ্জনার!

রূপক- রূপান্তরিত করার চেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছু নেই’ (সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়আজকাল১৩..১৯৯৭)

বহু আলোচক গিন্সবার্গকে পোস্টমডার্ন কবি হিসেবে উল্লেখ করতে চান৷ কিন্তু গিন্সবার্গ নিজেকে পোস্টমডার্ন অভিধায় অভিহিত করতে অস্বস্তি বোধ করতেন৷ যেহেতু তিনি কোনও প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসন বা বিদ্যায়তনিক চোখরাঙানিকে কখনও মেনে চলেননি তাই সমালোচকদের কারো কারো মতে তিনি পোস্টমডার্ন৷ আর অ্যালেনের মতেপ্রকৃত পোস্টমডার্ন উইলিয়ম বারোজ  হার্বার্ট হাংকে৷ এই বারোজের লেখা ‘নেকেড লাঞ্চ’ চলচ্চিত্রায়িত হয়৷ এই চলচ্চিত্রে বারোজকেরুয়াকগিন্সবার্গ প্রমুখের চরিত্র উপস্থিত৷ যদিও তাঁদের ভূমিকায় পেশাদার অভিনেতারা অভিনয় করেছেন৷ আর ‘নেকেড লাঞ্চ’ সম্পর্কে অ্যালেনের বক্তব্য:

চলচ্চিত্রের তুলনায় বারোজের প্লট অনেক ভালো ছিল৷ বারোজ আইন-কানুনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেই নিজেকে ক্ষমতা অর্পণ করেছিলেন৷ এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তর্ক যার প্রসঙ্গ বারোজ তুলেছিলেন৷ কিন্তু এই প্রসঙ্গটি চলচ্চিত্রে নেই

মৃত্যুর এক বছর আগে অ্যালেন তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের বইপত্রিকাচিঠিপত্রপাণ্ডুলিপি ইত্যাদি সাড়ে চার কোটি টাকায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে বিক্রি করেছিলেন৷ সেই টাকায় স্থাপিত হয় ‘অ্যালেন গিন্সবার্গ ট্রাস্ট যদিও তার বহু আগে নিজের ব্যক্তিগত রোজগারের টাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন--- ‘অ্যালেন গিন্সবার্গ ফাউন্ডেশন

কলকাতা  ঢাকার বহু কবিলেখকের নিউইয়র্ক বাসের হোটেল খরচ মেটানো হয়েছে এই ফাউন্ডেশনের তহবিল থেকে’ (মলয় রায়চৌধুরীকবিতা ইস্তাহার)

পরিশেষে ‘কৃত্তিবাস’-এর ইতিহাসকার ফণিভূষণ আচার্যের একটি মন্তব্য উল্লেখ করা যাক,

গিন্সবার্গ কলকাতার কবিদের দিয়ে গেল অনেক৷ নেশা দিয়ে গেলক্রোধ দিয়ে গেলএক কথায়তাদের অশান্ত করে দিয়ে গেল৷ বাংলা কবিতা তার দ্বারা উপকৃত হয়েছে সুপ্রচুরসন্দেহ নেই৷ বাংলা কবিতায় এল আধুনিক জীবনবোধতির্যক দৃষ্টিকোণএল বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহ’(ছেঁড়া ক্যানভাস১৩৯৭)

শেষ পর্যন্ত তৃতীয়বারের ভারত-ভ্রমণ অ্যালেনের হয়ে উঠল না৷

(এই লেখায় উল্লিখিত ‘আমেরিকা’,‘হাউল’ কবিতাদুটি  ‘পলিটিক্সপোয়েট্রি অ্যান্ড ফাউন্ডেশনে সদস্যদের নেওয়া সাক্ষাৎকারের বঙ্গানুবাদ মলয় রায়চৌধুরীর করা৷ গিন্সবার্গের অন্যান্য কবিতাসাক্ষাৎকার  উদ্ধৃতির অনুবাদ আমার৷ এই লেখটি আমার 'উবুদশ' প্রকাশিত 'অবদমনের সাহিত্যঃ সাহিত্যের অবদমন' গ্রন্থ থেকে কবির জন্মশতবর্ষে এখানে পুনঃপ্রকাশিত হল। ---লেখক)


অ্যালেন গিন্সবার্গ ও পিটার অরলোভস্কি